জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল ও ফজিলত: জানুন বিস্তারিত

রমজান মাস চলে যাওয়ার পর মুমিন বান্দার মনে একটা শূন্যতা তৈরি হয়, ইস! যদি আরও কিছু সওয়াব করতে পারতাম। কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা আমাদের নিরাশ করেননি। তিনি রমজানের পরই আমাদের জন্য আরও একটি সুবর্ণ সুযোগ রেখেছেন, আর তা হলো জিলহজ মাস। আপনি কি জানেন, জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল ও ফজিলত এতটাই বেশি যে, রাসুল (সা.) এই দিনগুলোর আমলকে জিহাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলেছেন!

অনেকেই জানতে চান, জিলহজ্জ মাস কবে থেকে শুরু হয় এবং এই পবিত্র মাসটিতে আমাদের কী কী আমল করা উচিত। আমাদের দেশের অনেকেই শুধু কোরবানি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, কিন্তু এই মহান দিনগুলোর ইবাদত থেকে বঞ্চিত হন। lifestylequery.com-এর আজকের এই আর্টিকেলে আমরা কোরআন ও হাদিসের আলোকে জিলহজ্জ মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত নিয়ে আলোচনা করব। চলুন, জেনে নিই কীভাবে এই ১০ দিনকে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের সেরা মাধ্যমে পরিণত করতে পারি।

জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল ও ফজিলত জানুন বিস্তারিত


আর্টিকেলের অভারভিউ: জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল ও ফজিলত

জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল ও ফজিলত কী? জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন আল্লাহর কাছে বছরের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন। এই দিনগুলোর প্রধান আমল হলো, বেশি বেশি জিকির (তাকবির, তাহমিদ, তাহলিল) পাঠ করা, ১ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখা (বিশেষ করে ৯ জিলহজ আরাফার রোজা), নফল নামাজ পড়া, দান-সদকা করা এবং সামর্থ্য থাকলে কোরবানি ও হজ করা। এই দশ দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে বেশি প্রিয়।

জিলহজ্জ মাসের ফজিলত সম্পর্কে হাদিস ও কোরআনের কথা

ইসলামী শরিয়তে জিলহজ্জ মাসের ফজিলত অপরিসীম। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সূরা ফজর-এ এই দশ রাতের শপথ করেছেন, যা জিলহজের প্রথম দশকের ফজিলত প্রমাণ করে।

জিলহজ্জ মাসের ফজিলত সম্পর্কে হাদিস: ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে যত বেশি প্রিয়, অন্য কোনো দিনের আমল তত প্রিয় নয়।" সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, "ইয়া রাসুলুল্লাহ! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি নয়?" রাসুল (সা.) বললেন, "জিহাদও নয়, তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন যে নিজের প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে জিহাদে বের হয়েছে এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসেনি।" (বুখারি: ৯৬৯)।

জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল ও করণীয়

এই মূল্যবান দশটি দিনে আমাদের কী কী করা উচিত? জিলহজ্জ মাসের করণীয় আমলগুলোকে আমরা কয়েকটি ধাপে ভাগ করতে পারি:

১. জিলহজ মাসের রোজা (১ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত)

জিলহজ্জ মাসের রোজা কয়টি? মূলত ১ জিলহজ থেকে শুরু করে ৯ জিলহজ (আরাফার দিন) পর্যন্ত মোট ৯টি রোজা রাখা মুস্তাহাব বা সুন্নাত। এই দিনগুলোর রোজা রাখা অনেক সওয়াবের কাজ। জিলহজ মাসের রোজার ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে বলা হয়েছে, এই দশকের প্রতিটি রোজার সওয়াব এক বছর রোজা রাখার সমান।

২. আরাফার রোজা (৯ জিলহজ)

আরাফার রোজা কয়টি? আরাফার রোজা মূলত একটি, যা ৯ জিলহজ (হাজিদের আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের দিন) রাখা হয়। যারা হজে যাননি, তাদের জন্য এই রোজাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, "আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আরাফার দিনের রোজার বিনিময়ে তিনি বান্দার আগের এক বছর এবং পরের এক বছরের (মোট ২ বছরের) সগিরা গুনাহ মাফ করে দেবেন।" (মুসলিম: ১১৬২)।

৩. বেশি বেশি তাকবির ও জিকির পাঠ

জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিন কি পড়তে হয়? বা জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের দোয়া কী? এই দিনগুলোতে বেশি বেশি তাকবির (আল্লাহু আকবার), তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) এবং তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) পাঠ করা সুন্নাত।

জিলহজের তাকবীর কি? ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একবার "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ" পড়া ওয়াজিব। একে তাকবিরে তাশরিক বলা হয়।

৪. কোরবানি করার প্রস্তুতি (চুল-নখ না কাটা)

জিলহজ্জ মাসের আমল আল কাউসার এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, যে ব্যক্তি কোরবানি করার নিয়ত করেছেন, তার জন্য জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে কোরবানি করা পর্যন্ত নিজের চুল, নখ এবং শরীরের কোনো পশম না কাটা মুস্তাহাব। এটি হাজিদের সাথে একাত্মতা প্রকাশের একটি প্রতীকী আমল।

৫. দান-সদকা ও নফল ইবাদত

জিলহজ্জ মাসের আমল ও ফজিলত বাড়াতে এই দশ দিনে বেশি বেশি নফল নামাজ (যেমন- তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত), কোরআন তিলাওয়াত এবং গরিব-দুঃখীদের মাঝে দান-সদকা করা উচিত।

সাধারণ ভুলসমূহ (Common Mistakes)

জিলহজ মাসের আমল করতে গিয়ে আমরা কিছু সাধারণ ভুল করে থাকি, যা থেকে বিরত থাকা উচিত:

  • ১০ জিলহজ রোজা রাখা: অনেকেই জানতে চান জিলহজ মাসের ১০ম দিন রোজা রাখা যাবে কি? উত্তর হলো, না! ঈদুল আজহার দিন (১০ জিলহজ) এবং এর পরের ৩ দিন (১১, ১২, ১৩ জিলহজ) অর্থাৎ 'আইয়ামে তাশরিক'-এর দিনগুলোতে রোজা রাখা সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ। রোজা রাখতে হবে ১ থেকে ৯ জিলহজ পর্যন্ত।
  • শুধু কোরবানিতে ব্যস্ত থাকা: অনেকেই কোরবানির গরু কেনা ও গোশত কাটার ব্যস্ততায় ঈদের দিনের ফরজ নামাজ এবং তাকবিরে তাশরিক পড়তে ভুলে যান, যা অত্যন্ত বড় একটি ভুল।
  • চুল-নখ কাটার নিয়ম না জানা: অনেকেই মনে করেন চুল-নখ না কাটা ওয়াজিব বা ফরজ। এটি আসলে মুস্তাহাব। কেউ ভুল করে কেটে ফেললে তার কোরবানির কোনো ক্ষতি হবে না, তবে তিনি একটি সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন।

প্রো টিপস (Pro Tips)

  • জিলহজ্জ মাস কবে থেকে শুরু তা আগে থেকেই ক্যালেন্ডারে বা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের খবর দেখে নিশ্চিত হয়ে নিন, যাতে ১ তারিখ থেকেই রোজা ও আমল শুরু করতে পারেন।
  • যাদের টানা ৯ দিন রোজা রাখার শারীরিক সামর্থ্য নেই, তারা অন্তত ৯ জিলহজ অর্থাৎ আরাফার রোজাটি কোনোভাবেই মিস করবেন না।
  • রাস্তাঘাটে, অফিসে বা কাজের ফাঁকে মনে মনে সবসময় 'সুবহানাল্লাহ', 'আলহামদুলিল্লাহ', 'আল্লাহু আকবার' জিকির করতে থাকুন। এটি জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত লাভের সবচেয়ে সহজ উপায়।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. জিলহজ মাসের ফজিলত কী কী?

উত্তর: জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন আল্লাহর কাছে বছরের সেরা দিন। এই দশ দিনে ইবাদত করলে জিহাদের চেয়েও বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। এই দিনগুলোতে হজ, কোরবানি, আরাফার রোজা এবং তাকবিরে তাশরিকের মতো মহান ইবাদতগুলো রয়েছে।

২. জিলহজের ৯ দিন রোজা রাখতে হবে কি?

উত্তর: জিলহজ মাসের ১ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখা সুন্নাত বা মুস্তাহাব, এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়। কেউ চাইলে ৯ দিনই রাখতে পারেন, অথবা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কয়েকদিনও রাখতে পারেন।

৩. জিলহজের রোজা রাখার ফজিলত কি?

উত্তর: হাদিস অনুযায়ী, জিলহজ মাসের প্রথম দশকের প্রতিটি রোজা এক বছর নফল রোজা রাখার সমান সওয়াব এবং প্রতিটি রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের ইবাদতের সমান সওয়াব বয়ে আনে।

৪. জিলহজ মাসের আমল কি কি?

উত্তর: প্রধান আমলগুলো হলো: রোজা রাখা, বেশি বেশি তাকবির (আল্লাহু আকবার) পাঠ করা, নফল ইবাদত বাড়ানো, দান-সদকা করা, চুল-নখ না কাটা (কোরবানি দাতার জন্য) এবং সামর্থ্য থাকলে হজ ও কোরবানি করা।

৫. জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন কে  কী বলা হয়?

উত্তর: জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার দিন থেকে শুরু করে ঈদুল আজহার দিন (১০ জিলহজ) পর্যন্ত সময়কে জিলহজের প্রথম ১০ দিন বা 'আশরায়ে জিলহজ' বলা হয়।

৬. জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের দোয়া ও জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিন কি পড়তে হয়?

উত্তর: এই দিনগুলোতে নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নেই, তবে বেশি বেশি "সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার" জিকির পড়া সুন্নাত।

৭. জিলহজ মাসের ১০ম দিন রোজা রাখা যাবে কি?

উত্তর: না, ১০ জিলহজ বা ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম। রোজা রাখতে হবে জিলহজ মাসের ১ তারিখ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত।

৮. আরাফার দিন কোন সূরা পড়তে হয়?

উত্তর: আরাফার দিনে নির্দিষ্ট কোনো সূরা পড়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে এই দিনে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত, ইস্তেগফার এবং দোয়া করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।

৯. জিলহজ মাসে কি দুআ কবুল হয়?

উত্তর: হ্যাঁ, বিশেষ করে জিলহজ মাসের ৯ তারিখ (আরাফার দিন) আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বেশি বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন এবং এই দিনের দোয়া আল্লাহ সবচেয়ে বেশি কবুল করেন।

১০. জিলহজ কবে থেকে শুরু হয়?

উত্তর: জিলকদ মাসের ২৯ বা ৩০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর আকাশে নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে ইসলামী ক্যালেন্ডারের ১২তম মাস জিলহজ শুরু হয়।

১১. জিলহজের তাকবীর কি?

উত্তর: তাকবিরটি হলো- "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।" এটি ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত ফরজ নামাজের পর একবার পড়া ওয়াজিব।

১২. জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিন করণীয়?

উত্তর: ইবাদতের পরিমাণ বাড়ানো, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, কোরবানি করার নিয়ত থাকলে চুল-নখ না কাটা এবং তাকবির ও জিকির বেশি বেশি পাঠ করাই হলো এই দিনগুলোর প্রধান করণীয়।

১৩. জিলহজের কবে থেকে হজ্জ শুরু হয়?

উত্তর: জিলহজ মাসের ৮ তারিখ থেকে হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় এবং ১২ জিলহজ পর্যন্ত তা চলতে থাকে। এর মধ্যে ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের প্রধান ফরজ কাজ।

আরো জানুনঃ কোরবানির পশু কেনার নিয়ম: সঠিক পশু বাছাই, বয়স ও গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক নির্দেশনা

আর্টিকেলের শেষ কথা: 

রমজানের পর আমরা হয়তো ভাবি, ইবাদতের বড় সুযোগগুলো বুঝি শেষ হয়ে গেল। কিন্তু জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল ও ফজিলত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর রহমতের দরজা সব সময় খোলা। জিলহজ্জ মাসের ফজিলত এতটাই বিশাল যে, সামান্য একটু চেষ্টা এবং সদিচ্ছা থাকলেই আমরা এই জিলহজের প্রথম দশকের ফজিলত অর্জন করে আমাদের পরকালকে সুন্দর করতে পারি।

lifestylequery.com-এর পক্ষ থেকে আপনাদের সবার জন্য রইল পবিত্র জিলহজ মাসের অগ্রিম শুভেচ্ছা। জিলহজ্জ মাসের আমল ও ফজিলত নিয়ে লেখা এই আর্টিকেলটি কি আপনার ইমানি শক্তিকে একটু হলেও উজ্জীবিত করতে পেরেছে? এই পবিত্র দিনগুলোতে আপনি কোন আমলটি সবচেয়ে বেশি করতে চান, তা কমেন্ট করে আমাদের জানান। আর হ্যাঁ, এই সওয়াবের কথাগুলো আপনার পরিবার, আত্মীয় এবং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে সাদাকায়ে জারিয়ার অংশীদার হোন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মহামূল্যবান দিনগুলোর সঠিক মর্যাদা দেওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন!

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

লাইফস্টাইল কোয়েরির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url