সুন্দর, কোমল এবং সতেজ ত্বক আমাদের সবারই কাম্য। কিন্তু এই সুন্দর ত্বক পাওয়ার পথে অন্যতম বড় একটি বাধা হলো শুষ্ক ত্বক। যাদের ত্বক প্রাকৃতিকভাবে শুষ্ক, তারা সারা বছর জুড়েই এক ধরনের অস্বস্তিতে ভোগেন। ত্বক টানটান হয়ে থাকা, খসখসে ভাব, চামড়া ওঠা কিংবা ত্বকে চুলকানি, এগুলো শুষ্ক ত্বকের খুব সাধারণ সমস্যা। বিশেষ করে আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় বা শীতকালে এই সমস্যা যেন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনেকেই মনে করেন শুধু মুখে একটু ক্রিম মেখে নিলেই বোধহয় শুষ্ক ত্বকের যত্ন নেওয়া হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে একটি শুষ্ক ত্বকের প্রয়োজন বিশেষ মনোযোগ, গভীর আর্দ্রতা এবং সঠিক একটি স্কিন কেয়ার রুটিন।
সঠিকভাবে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে না পারলে শুষ্ক ত্বক খুব দ্রুত বুড়িয়ে যায়। মুখে বলিরেখা, ফাইন লাইনস বা রিংকেলস খুব অল্প বয়সেই দেখা দিতে শুরু করে। তবে আপনার ত্বক যদি শুষ্ক হয়, তাতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। সঠিক একটি ড্রাই স্কিন কেয়ার রুটিন মেনে চললে এবং দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে কিছু সহজ পরিবর্তন আনলে খুব সহজেই আপনি পেতে পারেন সতেজ ও প্রাণবন্ত ত্বক। আজকের এই বিস্তারিত আর্টিকেলে আমরা ধাপে ধাপে আলোচনা করব ত্বক শুষ্ক হওয়ার কারণ, কোন ধরণের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা উচিত, স্পেশাল শীতের ত্বকের যত্ন কীভাবে নিতে হবে এবং সহজ ও কার্যকরী কিছু ঘরোয়া স্কিন কেয়ার সম্পর্কে। চলুন তবে জেনে নিই শুষ্ক ত্বককে কোমল ও উজ্জ্বল করার বিজ্ঞানসম্মত এবং প্রাকৃতিক উপায়গুলো।
.webp)
ত্বক শুষ্ক হওয়ার কারণ (কেন ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়?)
ত্বকের শুষ্কতা দূর করার আগে আমাদের জানা প্রয়োজন ঠিক কী কী কারণে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়। কারণগুলো সঠিকভাবে জানলে সমস্যার সমাধান করা অনেক বেশি সহজ হয়। নিচে প্রধান কিছু ত্বক শুষ্ক হওয়ার কারণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
১. প্রাকৃতিক কারণ ও জেনেটিক্স
অনেকের ত্বক জন্মগতভাবেই শুষ্ক হয়। পরিবারে বাবা বা মায়ের যদি শুষ্ক ত্বক থাকে, তবে জিনগত কারণে সন্তানেরও শুষ্ক ত্বক হতে পারে। এছাড়া বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের ত্বকের সেবাসিয়াস গ্ল্যান্ড থেকে সিবাম (প্রাকৃতিক তেল) উৎপাদন প্রাকৃতিকভাবেই কমে যায়। যার ফলে ত্বক ধীরে ধীরে তার নিজস্ব আর্দ্রতা হারিয়ে শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে পড়ে।
২. আবহাওয়ার প্রভাব এবং পরিবেশ
আবহাওয়া আমাদের ত্বকের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ একদম কমে যায়। তখন শুষ্ক বাতাস আমাদের ত্বক থেকে আর্দ্রতা শুষে নেয়। এই কারণেই শীতকালে ত্বক ফেটে যায় এবং অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে পড়ে। শুধু শীতকাল নয়, অতিরিক্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) রুমে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করলেও ত্বক তার আর্দ্রতা হারিয়ে শুষ্ক হয়ে যায়।
৩. অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল করা
অনেকেই সারাবছর হালকা গরম পানিতে বা শীতকালে কড়া গরম পানিতে গোসল করতে পছন্দ করেন। কিন্তু অতিরিক্ত গরম পানি ত্বকের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। গরম পানি ত্বকের উপরিভাগে থাকা ন্যাচারাল অয়েল বা সুরক্ষামূলক তেলের স্তর ধুয়ে ফেলে। ফলে ত্বক খুব দ্রুত তার আর্দ্রতা হারিয়ে ফেলে এবং খসখসে হয়ে যায়।
৪. ক্ষারযুক্ত সাবান ও ফেসওয়াশের ব্যবহার
বাজারের অনেক সাবান এবং ফেসওয়াশে উচ্চমাত্রার ক্ষার এবং কেমিক্যাল থাকে। এগুলো ত্বকের ময়লা পরিষ্কার করার পাশাপাশি ত্বকের প্রয়োজনীয় আর্দ্রতাও পুরোপুরি কেড়ে নেয়। ভুল ক্লিনজার বা কড়া সাবান ব্যবহারের কারণে ত্বক রুক্ষ হয়ে যাওয়া খুব সাধারণ একটি বিষয়।
৫. শরীরে পানির অভাব বা ডিহাইড্রেশন
ত্বকের আসল সজীবতা আসে শরীরের ভেতর থেকে। আপনি যদি প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান না করেন, তবে আপনার শরীর ডিহাইড্রেটেড বা পানিশূন্য হয়ে পড়বে। আর শরীরের এই পানিশূন্যতার প্রথম এবং প্রধান প্রভাব পড়ে ত্বকে। কোষে কোষে পর্যাপ্ত পানি না পৌঁছালে ত্বক শুষ্ক, প্রাণহীন ও ফ্যাকাশে দেখায়।
সঠিক ড্রাই স্কিন কেয়ার রুটিন (সকাল ও রাত)
শুষ্ক ত্বকের অধিকারীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ও সঠিক স্কিন কেয়ার রুটিন থাকা অত্যন্ত জরুরি। যেকোনো প্রোডাক্ট ব্যবহার না করে, নিয়ম মেনে যত্ন নিলে ত্বক ভালো থাকে। নিচে শুষ্ক ত্বকের জন্য সকাল এবং রাতের যত্নের একটি বিস্তারিত গাইডলাইন দেওয়া হলো:
সকালে শুষ্ক ত্বকের যত্ন
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর শুষ্ক ত্বকের বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন, যাতে সারাদিন ত্বক হাইড্রেটেড থাকে।
- ক্লিনজিং: সকালে কখনোই অতিরিক্ত ক্ষারযুক্ত ফেসওয়াশ ব্যবহার করবেন না। সকালে ত্বক খুব একটা ময়লা থাকে না, তাই শুধু সাধারণ পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নেওয়া যেতে পারে। ফেসওয়াশ ব্যবহার করতে চাইলে অত্যন্ত মাইল্ড বা ক্রিম-বেসড ফেসওয়াশ বেছে নিন।
- টোনিং: অ্যালকোহল-যুক্ত টোনার শুষ্ক ত্বকের শত্রু। এর বদলে অ্যালকোহল-মুক্ত এবং হাইড্রেটিং টোনার (যেমন- রোজ ওয়াটার বা গোলাপ পানি) ব্যবহার করুন।
- হাইড্রেটিং সিরাম: মুখ ধোয়ার পর ত্বক হালকা ভেজা থাকতেই হায়ালুরনিক এসিড সিরাম ব্যবহার করতে পারেন, যা ত্বকের গভীরে পানি ধরে রাখে।
- ময়েশ্চারাইজিং: এরপর একটি ভালো মানের ক্রিম বেসড ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিন। এটি ত্বকে আর্দ্রতার একটি লেয়ার তৈরি করবে।
- সানস্ক্রিন: বাইরে যাওয়ার আগে এবং ঘরে থাকলেও দিনের বেলায় অবশ্যই এসপিএফ (SPF) ৩০ বা তার বেশি মাত্রার ক্রিম-বেসড সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে ভুলবেন না।
রাতে শুষ্ক ত্বকের যত্ন
সারাদিনের ধুলোবালি, দূষণ ও মেকআপ দূর করে ত্বককে রিল্যাক্স করতে রাতের স্কিন কেয়ার রুটিন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
- ডাবল ক্লিনজিং: শুষ্ক ত্বকে ডাবল ক্লিনজিং খুব ভালো কাজ করে। প্রথমে অয়েল ক্লিনজার, ক্লিনজিং বাম বা মাইসেলার ওয়াটার দিয়ে মেকআপ ও সানস্ক্রিন তুলুন। তারপর মাইল্ড ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে ধুয়ে নিন।
- নাইট সিরাম ও অয়েল: রাতে ত্বকের সেল রিনিউয়াল হয়। তাই রাতে ভিটামিন ই সিরাম বা মুখের জন্য উপযোগী কোনো ফেস অয়েল (যেমন- স্কোয়ালেন অয়েল) ব্যবহার করতে পারেন।
- নাইট ক্রিম: সবশেষে একটি ভারী টেক্সচারের নাইট ক্রিম বা ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করে ঘুমিয়ে পড়ুন। এটি সারারাত আপনার ত্বককে পুষ্টি জোগাবে।
সেরা ময়েশ্চারাইজার কীভাবে বেছে নেবেন?
শুষ্ক ত্বকের প্রধান খাদ্য হলো ময়েশ্চারাইজার। কিন্তু বাজারে থাকা হাজারো প্রোডাক্টের মধ্যে কোনটি আপনার শুষ্ক ত্বকের জন্য সেরা তা বুঝবেন কীভাবে?
উপাদান বা ইনগ্রিডিয়েন্টস খেয়াল করুন
ময়েশ্চারাইজার কেনার আগে এর পেছনের উপাদানের তালিকা চেক করা বুদ্ধিমানের কাজ। শুষ্ক ত্বকের জন্য এমন ময়েশ্চারাইজার খুঁজবেন যেগুলোতে নিচের উপাদানগুলো রয়েছে:
- হায়ালুরনিক এসিড (Hyaluronic Acid): এটি নিজের ওজনের চেয়ে ১০০০ গুণ বেশি পানি ধরে রাখতে পারে। এটি ত্বকে পানির শূন্যতা পূরণ করে।
- সিরামাইডস (Ceramides): আমাদের ত্বকের বাইরের স্তর সুরক্ষিত রাখতে সিরামাইডস সাহায্য করে। এটি ত্বকের ব্যারিয়ারকে শক্তিশালী করে এবং ভেতরের আর্দ্রতা বাইরে বের হতে দেয় না।
- গ্লিসারিন ও শিয়া বাটার (Glycerin & Shea Butter): এই উপাদানগুলো ত্বককে গভীরভাবে নরম ও মসৃণ করে।
- ল্যাকটিক এসিড (Lactic Acid): এটি খুব মৃদুভাবে ত্বকের মরা চামড়া দূর করে এবং ত্বককে হাইড্রেটেড রাখে।
লোশন নাকি ক্রিম?
শুষ্ক ত্বকের জন্য পাতলা বডি লোশনের চেয়ে ভারী ক্রিম বা অয়েনমেন্ট বেশি কার্যকর। কারণ ক্রিম বা বাটার জাতীয় প্রোডাক্ট ত্বকের ওপর একটি প্রলেপ তৈরি করে, যা দীর্ঘক্ষণ আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
বিশেষ শীতের ত্বকের যত্ন
শীতকাল মানেই শুষ্ক ত্বকের মানুষদের জন্য এক আতঙ্কের নাম। এই সময়ে বাতাসে আর্দ্রতা না থাকায় ত্বক ফেটে রক্ত পর্যন্ত বের হতে পারে। তাই এই সময়ে শীতের ত্বকের যত্ন নিতে কিছু বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়:
- গোসলের অন্তত ৩০ মিনিট আগে পুরো শরীরে অলিভ অয়েল বা নারকেল তেল ভালোভাবে ম্যাসাজ করে নিতে পারেন। এটি ত্বকে একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করবে।
- গোসলের জন্য কড়া গরম পানি ব্যবহার করবেন না; বরং হালকা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন এবং ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে দ্রুত গোসল শেষ করুন।
- গোসলের পর শরীর মোছার সময় খসখসে তোয়ালে দিয়ে খুব জোরে ঘষবেন না। ত্বক হালকা ভেজা থাকতেই পুরো শরীরে ভারী বডি লোশন বা বডি বাটার মেখে নিন।
- শীতকালে ঠোঁট ফাটা এবং পায়ের গোড়ালি ফাটা রোধ করতে রাতে ঘুমানোর আগে পেট্রোলিয়াম জেলি বা গ্লিসারিন ব্যবহার করুন। পায়ে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগিয়ে মোজা পরে ঘুমালে পা খুব নরম থাকে।
- ঘরে রুম হিটার ব্যবহার করলে সাথে একটি হিউমিডিফায়ার (Humidifier) ব্যবহার করতে পারেন, যা ঘরের বাতাসে আর্দ্রতা ধরে রাখবে।
কার্যকরী ঘরোয়া স্কিন কেয়ার (প্রাকৃতিক উপায়)
বাজারে অনেক দামি দামি প্রসাধনী পাওয়া যায়, তবে প্রাকৃতিকভাবে ত্বক সুন্দর ও সুস্থ রাখতে ঘরোয়া স্কিন কেয়ার এর কোনো তুলনা নেই। আমাদের রান্নাঘরে থাকা সাধারণ ও সস্তা কিছু উপাদান দিয়েই শুষ্ক ত্বকের চমৎকার যত্ন নেওয়া যায়। নিচে কয়েকটি প্রমাণিত উপায় দেওয়া হলো:
১. মধু ও দুধের ফেস প্যাক
মধু হলো একটি চমৎকার প্রাকৃতিক হিউমেকট্যান্ট, যা পরিবেশ থেকে আর্দ্রতা টেনে এনে ত্বকে ধরে রাখে। আর কাঁচা দুধে থাকা ল্যাকটিক এসিড ত্বকের মৃত কোষ বা মরা চামড়া দূর করে ত্বক উজ্জ্বল করে। ২ চামচ কাঁচা দুধের সাথে ১ চামচ খাঁটি মধু মিশিয়ে মুখে লাগান। ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি শুষ্ক ত্বকের জন্য জাদুকরী কাজ করে।
২. অ্যালোভেরা জেলের ব্যবহার
অ্যালোভেরা জেলের হাইড্রেটিং বা আর্দ্রতা প্রদানের ক্ষমতা অসাধারণ। আপনার যদি কোনো ভালো নাইট ক্রিম না থাকে, তবে রাতে ঘুমানোর আগে খাঁটি অ্যালোভেরা জেল (গাছ থেকে নেওয়া বা বাজারের ভালো ব্র্যান্ডের) ত্বকে ম্যাসাজ করে ঘুমিয়ে পড়তে পারেন। সকালে উঠে দেখবেন ত্বক কতটা নরম, মসৃণ ও হাইড্রেটেড দেখাচ্ছে।
৩. নারকেল তেল বা অলিভ অয়েল ম্যাসাজ
যুগ যুগ ধরে রূপচর্চায় প্রাকৃতিক তেলের ব্যবহার হয়ে আসছে। এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল বা কোল্ড প্রেসড বিশুদ্ধ নারকেল তেল ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে পুষ্টি যোগায়। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে কয়েক ফোঁটা তেল হাতের তালুতে ঘষে সামান্য গরম করে মুখে সার্কুলার মোশনে ম্যাসাজ করতে পারেন। এটি ত্বকের রক্ত সঞ্চালনও বাড়ায়।
৪. পাকা পেঁপে ও মধুর প্যাক
পাকা পেঁপে ব্লেন্ড করে তার সাথে সামান্য মধু মিশিয়ে মুখে লাগালে ত্বকের খসখসে ভাব খুব দ্রুত দূর হয়। পেঁপেতে থাকা এনজাইম ত্বকের মৃত কোষ সরিয়ে ফেলে এবং এটি ত্বকে প্রাকৃতিক গ্লো বা উজ্জ্বলতা এনে দেয়।
৫. ওটমিল বাথ বা প্যাক
অতিরিক্ত শুষ্ক এবং চুলকানিযুক্ত ত্বকের জন্য ওটমিল খুব উপকারী। ওটমিল গুঁড়ো করে সামান্য পানি বা দুধের সাথে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে মুখে লাগাতে পারেন। এটি ত্বকের চুলকানি ও লালচে ভাব দূর করে ত্বককে শান্ত করে।
শুষ্ক ত্বকে কোন খাবার ভালো (খাদ্যাভ্যাস)
শুধু বাইরে থেকে ক্রিম মেখে বা প্যাক লাগিয়ে যত্ন নিলেই হবে না, ভেতর থেকেও ত্বককে স্বাস্থ্যকর রাখতে হবে। খাদ্যাভ্যাস ত্বকের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
- পর্যাপ্ত পানি পান: প্রতিদিন অন্তত ৮-১০ গ্লাস বা ২-৩ লিটার বিশুদ্ধ পানি পান করুন। এটি শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বের করে ত্বককে সতেজ ও টানটান রাখে।
- ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড যুক্ত খাবার: খাদ্যতালিকায় সামুদ্রিক মাছ, কাঠবাদাম, আখরোট, ফ্ল্যাক্স সিড এবং চিয়া সিডস রাখুন। এই খাবারগুলো ত্বকের ভেতরের প্রাকৃতিক তেলের ব্যালেন্স ঠিক রাখে।
- ভিটামিন ই ও সি: ভিটামিন ই সমৃদ্ধ খাবার (যেমন পালং শাক, বাদাম) এবং ভিটামিন সি যুক্ত তাজা ফলমূল (লেবু, কমলা, মাল্টা) ত্বককে ভেতর থেকে হাইড্রেটেড, কোলাজেন পূর্ণ ও স্বাস্থ্যকর রাখে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী(FAQ)
১. শুষ্ক ত্বকের যত্ন কিভাবে নেবেন?
শুষ্ক ত্বকের যত্ন নিতে হলে প্রতিদিন সকালে ও রাতে মাইল্ড ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে একটি ভারী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে। গোসলে অতিরিক্ত গরম পানি পরিহার করতে হবে, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে এবং সপ্তাহে অন্তত দুদিন প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি হাইড্রেটিং ফেস প্যাক ব্যবহার করতে হবে।
২. ত্বক শুষ্ক হয় কেন?
ত্বক শুষ্ক হওয়ার মূল কারণ হলো ত্বকে প্রাকৃতিক তেলের (সিবাম) অভাব এবং পানিশূন্যতা। এছাড়াও শুষ্ক আবহাওয়া, অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল, ক্ষারযুক্ত কড়া সাবানের ব্যবহার, বয়স বৃদ্ধি এবং জিনগত কারণে ত্বক শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে থাকে।
৩. শুষ্ক ত্বকের জন্য কোন ময়েশ্চারাইজার ভালো?
শুষ্ক ত্বকের জন্য সেই ময়েশ্চারাইজার ভালো যেগুলোতে হায়ালুরনিক এসিড, সিরামাইডস, গ্লিসারিন, স্কোয়ালেন এবং শিয়া বাটার এর মতো উপাদান রয়েছে। পাতলা লোশনের চেয়ে ভারী টেক্সচারের ক্রিম বা অয়েনমেন্ট-বেসড ময়েশ্চারাইজার শুষ্ক ত্বকের জন্য সবচেয়ে বেশি কার্যকরী।
৪. শুষ্ক ত্বকে কি লাগানো উচিত?
শুষ্ক ত্বকে সবসময় আর্দ্রতা প্রদানকারী এবং পুষ্টিকর উপাদান লাগানো উচিত। এর মধ্যে রয়েছে অ্যালোভেরা জেল, মধু, কাঁচা দুধ, গ্লিসারিন এবং বিভিন্ন এসেনশিয়াল অয়েল (যেমন- এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, জোজোবা অয়েল বা বিশুদ্ধ নারকেল তেল)।
৫. শীতে ত্বক শুষ্ক হলে কি করবেন?
শীতে ত্বক শুষ্ক হলে দিনে অন্তত দুবার ভারী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে। গোসলের পর ত্বক হালকা ভেজা থাকতেই বডি লোশন বা অলিভ অয়েল পুরো শরীরে ম্যাসাজ করে নিতে হবে। এছাড়া শীতের শুষ্ক বাতাস থেকে বাঁচতে বাইরে বের হলে ত্বক যতটা সম্ভব ঢেকে রাখার চেষ্টা করতে হবে।
৬. শুষ্ক ত্বকের ঘরোয়া উপায় কি?
শুষ্ক ত্বকের ঘরোয়া উপায়ের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো মধু ও কাঁচা দুধের মিশ্রণ ত্বকে লাগানো। এছাড়া পাকা কলা বা পেঁপের সাথে মধু মিশিয়ে ফেস প্যাক তৈরি করে সপ্তাহে দুদিন মুখে লাগালে ত্বকের রুক্ষতা দূর হয় এবং ত্বক নরম থাকে।
৭. শুষ্ক ত্বকে কোন খাবার ভালো?
শুষ্ক ত্বকের জন্য ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড এবং ভিটামিন ই সমৃদ্ধ খাবার সবচেয়ে ভালো। খাদ্যতালিকায় সামুদ্রিক মাছ, অ্যাভোকাডো, আখরোট, কাঠবাদাম, সূর্যমুখীর বীজ এবং প্রচুর পরিমাণে পানি ও তাজা ফলের রস রাখা উচিত। এগুলো ত্বককে ভেতর থেকে পুষ্টি দেয়।
৮. শুষ্ক ত্বকে সাবান ব্যবহার করা উচিত কি?
না, শুষ্ক ত্বকে সাধারণ ক্ষারযুক্ত কড়া সাবান ব্যবহার করা মোটেও উচিত নয়। সাবান ত্বকের ন্যাচারাল অয়েল ধুয়ে ফেলে ত্বককে আরও রুক্ষ ও খসখসে করে দেয়। এর বদলে গ্লিসারিনযুক্ত মাইল্ড বডি ওয়াশ বা সোপ-ফ্রি ক্লিনজার ব্যবহার করা শুষ্ক ত্বকের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।
৯. রাতে শুষ্ক ত্বকের যত্ন কেমন?
রাতে শুষ্ক ত্বকের যত্নে ডাবল ক্লিনজিং পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রথমে মুখ পরিষ্কার করে নিতে হবে। এরপর একটি ভালো মানের হাইড্রেটিং টোনার ব্যবহার করে একটি ভারী নাইট ক্রিম বা মুখের ত্বকের জন্য উপযোগী কোনো ফেস অয়েল (যেমন আমন্ড অয়েল বা রোজহিপ অয়েল) ম্যাসাজ করে ঘুমাতে হবে।
১০. ড্রাই স্কিনে সানস্ক্রিন দরকার কি?
অবশ্যই দরকার। অনেকেই মনে করেন ড্রাই স্কিনে সানস্ক্রিন লাগে না, যা সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা। সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি শুষ্ক ত্বককে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে, পুড়িয়ে ফেলে এবং দ্রুত বলিরেখা বা এজিংয়ের ছাপ ফেলে দেয়। তাই বাইরে যাওয়ার আগে ড্রাই স্কিনের উপযোগী (ক্রিম-বেসড ও হাইড্রেটিং) ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে।
আর্টিকেলের শেষ কথা
ত্বক শুষ্ক হওয়াটা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়, তবে সঠিক সময়ে এর যত্ন না নেওয়াটা বোকামি। অবহেলা করলে এটি ত্বকের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে। সঠিক সময়ে সঠিক ড্রাই স্কিন কেয়ার রুটিন মেনে চললে এবং মানসম্পন্ন প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে শুষ্ক ত্বককেও অনায়াসেই নরম, কোমল ও লাবণ্যময় করে তোলা সম্ভব। উপরের উল্লেখিত ঘরোয়া স্কিন কেয়ার টিপস এবং নিয়মগুলো আপনার প্রতিদিনের রুটিনে আজ থেকেই যুক্ত করুন। মনে রাখবেন, শুধু দামি প্রসাধনী মাখলেই হবে না, বরং নিয়মিত যত্ন এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসই পারে আপনাকে একটি সুস্থ, উজ্জ্বল এবং আকর্ষণীয় ত্বক উপহার দিতে।
লাইফস্টাইল কোয়েরির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url